মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

উপজেলার পটভূমি

কামারখন্দের নামকরণ ও ইতিবৃত্ত

কামারখন্দের নাম করণ নিয়ে মনে হয় অনেকটা অনুমান নির্ভর অথবা কিংবদন্তী বা জনশ্রুতি কিংবা কল্পনা ভিত্তিক হতে পারে। ভাড়াঙ্গা গ্রামের জনাব মোঃ সোলয়মান আলী অফিসার (অবসর প্রাপ্ত) সোনালী ব্যাংক জামতৈল শাখা এবং ঝাটিবেলাই উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (অবসর প্রাপ্ত) জনাব মকবুল হোসেন সম্মানিত ব্যক্তিদ্বয়ের মতে বৃটিশ সরকারের আমলে এই অঞ্চল দিয়ে রেলপথ বসানোর সময় রেলকোম্পানী টুকরা লোহা ভাঙ্গা লোহা এবং অকেজো লক্করের বড় একটি চালান এই অঞ্চলের কোন এক ধর্ণাঢ্য ব্যক্তির নিকট নিলামে বিক্রি করে, ফলে লোহা লক্করের এক বিরাট মুজদ গড়ে ওঠে অত্র অঞ্চলে। কৃষি সরঞ্জামাদি এবং গৃহস্থালি লৌহজাত যন্ত্রপাতি তৈরির কাঁচামাল লোহা এই অঞ্চলে পাওয়া যায় বলে বিভিন্ন অঞ্চল হতে কর্মকারেরা এসে এই অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে উক্ত ধর্ণাঢ্য ব্যক্তির নিকট হতে লোহা ক্রয় করে দা, কুড়াল, খন্তা, কাচিঁ, পাচুন, ছুরি, চাকু ইত্যাদি তৈরি করে নিকটস্থ হাট বাজার ছাড়াও অনেকট দূর দূরান্তের হাট-বাজার ও মেলায় বিক্রি করত। অধিকাংশ কর্মকারেরা ছিল নিতান্তই গরীব, তাই তারা মহাজনের নিকট হতে বাকীতে লোহা ক্রয় করে লৌহজাতীয় কৃষি ও গৃহস্থালী যন্ত্রপাতি তৈরি করে হাট-বাজারে বিক্রি করে মহাজনের টাকা পরিশোধান্তে অবশিষ্ট যা থাকত সেই টাকায় নিজেদের পরিবারের ভরণপোষন করে দিনপাত কাটাত। মহাজনের নিকট হতে সুলোভমূল্যে বাকীতে লোহা ক্রয় করে সেই লোহা দ্বারা যন্ত্রপাতি তৈরি করে হাটে-বাজারে বিক্রি করে মহাজনের বাকী টাকা পর্যায়ক্রমে সহজ কিস্তিতে পরিশোধ করা সুবিধা পেয়ে বিভিন্ন অঞ্চল হতে কর্মকারেরা এসে এই অঞ্চলে অর্থাৎ বর্তমান জামতৈল ইউনিয়ন পরিষদের পশ্চিম পাশে বেশ কিছু বসতি গড়ে তোলে। বসতি বাড়তে বাড়তে এখানে একটি কামার পাড়া গড়ে ওঠে। কামার পাড়ার লোকজন বসত বাড়ীর দক্ষিণ পাশ হতে মাটি কেটে তাদের ঘরভিটা তৈরি করে। ফলে তাদের পাড়া দক্ষিণ পাশে একটি গর্ত খাদ বা খন্দক সৃষ্টি হয়। সেই খন্দকের পাশ দিয়ে ছিল জামতৈল ষ্টেশন হতে বাজার হয়ে জামতৈল গ্রামের ভিতর যাতায়াতের সরু রাস্তা।

কথিত আছে বৃটিশ সরকারের এক রেল কর্মকর্তা কোন কাজে কামার পাড়ার সেই খন্দকের পাড় দিয়ে সরু রাস্তা হয়ে যাওয়ার সময় খন্দকে পড়ে পা ভেঙ্গে যায়। বৃটিশ রেলওয়ে কোম্পানী হতে দুর্ঘটনার স্থান পরিদর্শন আসে। তদন্ত রিপোর্ট দুর্ঘটনার স্থান (spot) কামারপাড়া খন্দকের কথা লিপিবদ্ধ করা হয়। এই দুর্ঘটনার সাথে কামার পাড়ার লোকজন জড়িত আছে কিনা অথবা কামার পাড়ার লোকজন পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে কি না । তদন্তকারী কর্মকর্তারা বার বার তদন্তে এসে স্থানীয় লোকদেরকে দুর্ঘটনাস্থল কামারপাড়া খন্দক স্থানে নিয়ে যেতে বলে। সেই হতে কৌতহল জনতা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মুখ হতে কামার পাড়া খন্দক নামটি নিয়ে হাসি তামাসা শুরু করে। তদন্ত রিপোর্টে কামার পাড়া খন্দক তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মুখে মুখে কামার পাড়া খন্দক এবং জন সাধারণের মুখে মখে কামারপাড়া খন্দক প্রচার পেতে থাকে। কামারপাড়া খন্দক, কামারপড়া খন্দক বাক্যটি বার বার উচ্চারণ করতে সময় বেশী লাগে উচ্চারণেও অসুবিধা বোধ করে। উচ্চারণের সুবিধা ও সময় কমিয়ে আনার জন্য অর্থাৎ অল্প সময়ে সহজ উচ্চারণের জন্য কামার পাড়া খন্দক বাক্যটি হতে পাড়া শব্দটি বিলুপ্ত করে দিয়ে বলতে থাকে ‍কামারখন্দক। পরবর্তীতে শব্দটি হতে ব্যাঞ্জন বর্ণের প্রথম বর্ণটি বাদ দিয়ে বলতে তাকে কামারখন্দ।

জনাব মুস্তাফিজ তালুকদার (যু্গ্ন অতিরিক্ত সচিব অবঃ) বলেন কোন এক বিশিষ্ট আলেম পবিত্র ক্বোরআনের কামারুন শব্দটির সঙ্গে খন্ড শব্দটি যুক্ত করে এই অঞ্চলের নামকারণ করেন ‍কামারখন্ড। কামারুনের (চাদেঁর) একটি খন্ড বা টুকর অমানিশা কাটিয়ে দ্যুতি ছড়িয়েছে চতুর দিক। পরবর্তীতে কামারখন্ড নামটি রূপান্তরিত হয়ে রূপ লাভ করে কামারখন্দ।

 

বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশে বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে আসে এবং কালক্রমে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা গ্রহন করে। ঔপনিবেশিক আমলে বিভাগ, জেলা ও থানাকে প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে সৃষ্টি করে। ভারতের গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে বংগ প্রদেশকে ২৩ টি জেলায় বিভক্ত করেন। প্রতি জেলায় রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত দেওয়ানী মামলার শুনানী গ্রহনের জন্য একজন কালেক্টর নিয়োগ করেন।বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড অব ডাইরেক্টরস ১৭৮৬ খ্রিস্টব্দে দেশীয় দেওয়ানের পদ বিলোপ করে কালেক্টরকে স্থানীয় ইউনিট করার সিন্ধান্ত গ্রহন করে এবং রাজস্ব প্রশাসন, সিভিল জজ ও ম্যাজিষ্ট্রেট ইত্যাকার অফিসকে কালেক্টরের অফিসের সাথে সম্পক্ত করার জন্য সুপ্রীম কাউন্সিলকে নির্দেশ প্রদান করে। ‍উক্ত আদেশের প্রেক্ষিতে, মেকপারসন (Macpherson)১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে বংগ প্রদেশকে ৩৬ টি জেলায় বিভক্ত করে প্রত্যেক জেলায় একজন কালেক্টর নিয়োগ করেন। ১৭৯৩ খ্রিস্টব্দে কালেক্টরকে আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্ব, ম্যাজিষ্ট্রেসী ক্ষমতা প্রদান ও রাজস্ব আদায়ের সার্বিক দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৮৭২ খ্রিস্টব্দে স্যার জর্জ ক্যামবেল (Campbell), জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট এর ক্ষমতাকে আরও সূদৃঢ করেন। এ সময় জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ও কালেক্টরকে জেলা পর্যায়ে অন্যান্য বিভাগীয় অফিসের কাজকর্মের তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা প্রদান করার মাধ্যমে তাকে জেলা পর্যায়ে প্রধান নির্বাহী ও প্রশাসক হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে সাইমন কমিশন মত প্রকাশ করে যে, কালেক্টর জেলা প্রশাসকের প্রধান হিসেবে পুলিশ সুপার ও অন্যান্য কারিগরি বিভাগের প্রধানগনের ওপর থাকবেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টব্দে পাকিস্থান সৃষ্টি হবার পর থেকে সমগ্র দেশকে বিভাগ, জেলা ও মহকুমা এবং থানা পর্যায়ে প্রশাসনিক ইউনিটে রূপান্তর করা হয়। এ সময় জেলা প্রশাসক শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে। কালেক্টর /জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট /ডেপুটি কমিশনার জেলার প্রধান নির্বাহী হিসেবে জেলায়  তদারকী ও সমন্বয়মূলক ভূমিকা পালন করে আসছেন। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ বিভাগ, জেলা, মহকুমা ও থানা প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে বহাল থাকে এবং জেলা প্রশাসক শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে। জেলা প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট /কালেক্টর/ জেলা প্রশাসক জেলা রাজস্ব আদায়, আইন শৃংখলার সার্বিক দায়িত্ব ও ফৌজদারী বিচার প্রশাসনসহ আন্তবিভাগীয় কাজের সমন্বয় সাধন করেন। বর্তমানে জেলা প্রশাসক সাধারন, রাজস্ব প্রশাসন, ফৌজদারী বিচার প্রশাসন, আইন-শৃংখলা রক্ষা, উন্নয়নপ্রশাসন ছাড়াও জেলা পর্যায়ের আন্তঃবিভাগীয় কাজের সমন্বয় সাধনের মত গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমাদৃত। চারস্তর বিশিষ্ট্য প্রশাসনিক কাঠামোতে উপজেলা একটি শক্তিশালী ইউনিট।

 

বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এর কার্যালয়, কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের অধিনে জেলা প্রশাসক এর নিয়ন্ত্রনাধীন একটি অফিস। জেলা প্রশাসক জেলার মধ্যে এ অফিসেরনিয়ন্ত্রন করেন। সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ প্রাপ্ত উপজেলানির্বাহী অফিসার এ দপ্তরের প্রধান। মাঠ প্রশাসনে উপজেলা পর্যায়ে একটিপ্রধান নির্বাহী অফিস। মাঠ প্রশাসনের যাবতীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম, আইনশৃংখলা ও ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্ব, পাবলিক পরীক্ষা গ্রহন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, মনিটরিং ও তদারক, হাট-বাজার ইজারা প্রদান, ত্রাণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন, ভূমি প্রশাসন বিষয়ক কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও তদারক করা এ কার্যালয়ের কার্যক্রমের অর্ন্তভুক্ত। উপজেলা পরিষদের সাচিবিক দায়িত্ব সহ উপজেলা পর্যায়ের সকল বিভাগের কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন ও সরকার ঘোষিত বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাঠ পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিভূ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ছবি


সংযুক্তি


সংযুক্তি (একাধিক)



Share with :

Facebook Twitter